ভাষা ও সংষ্কৃতি

 

ভাষাঃ

খুলনা বিভাগের অন্তর্ভূক্ত জেলা গুলোতে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য উপজাতি বা আদিবাসী না থাকায় এ বিভাগের সকল অধিবাসীদের ভাষা বাংলা। এ বিভাগের অন্তর্গত বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলা পূর্বে ভারতের নদীয়া জেলার অন্তর্গত থাকায় কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা এলাকার অধিবাসীদের উচ্চারণে নদীয়া শান্তিপুরের টান লক্ষ্য করা যায়, যা পরিশীলিত ও শ্রুতিমধুর। এ বিভাগের যশোর, সাতক্ষীরা এবং অন্যান্য এলাকার  ভাষায় আঞ্চলিকতা থাকলেও তা সারা দেশে প্রচলিত ভাষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বৃহত্তর খুলনার উত্তর পশ্চিম এলাকা জুড়ে বিশেষ করে ভৈরব নদীর পশ্চিম তীর থেকে দৌলতপুর মহেশ্বরপাশা, আড়ংঘাটা, তেলিগাতী, ডাকাতিয়া, ডুমুরিয়া উপজেলার সমগ্র উত্তরাংশ, বৃহত্তর গ্রাম রংপুর, শাহপুর, যশোর জেলার দক্ষিণ পূর্বাংশ জুড়ে সমগ্র জনমানুষের মনের ভাব প্রকাশের যে ভাষা অর্থাৎ মাতৃভাষা তা হচ্ছে দৌলতপুরের আঞ্চলিক ভাষা। সে কবে থেকে আজও পর্যন্ত এ এলাকায় বিভিন্ন পূজা পার্বণে, নবান্নে, ধর্মীয় উৎসবে এ আঞ্চলিক ভাষার গান বাজনা, সয়ার পয়ার, পট, গাজীর গান, হারের গান ও অষ্টোক গান, রাম যাত্রা, পালা, কীর্তণে এ আঞ্চলিক ভাষায় গীত হয়ে আসছে। এ আঞ্চলিক ভাষার একটি গানের অংশ-

আশ্বিন গেল কাততিক আ'লো

মা লক্ষ্মী ঘরে আ’লো

ধান সত খায় রে হৈ।

‘‘ধান পড়েছে গড়ায়ে

শিয়েল গেল নড়োয়ে’’

ধান সত খায় রে হৈ।

খুলনা বিভাগের সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যে আঞ্চলিক ভাষা প্রচলিত আছে তা সুন্দরবনের জঙ্গলা ভাষা হিসেবে পরিচিত। যেমন-

কালাবন- নিবিড়বন।

খাদাড়ী বা খালাড়ী- লবণের কারখানা।

খেঁড়ো- গাজীর গিতের মূল গাইন বা গাথক।

গাছাল- গাছে বসে শিকার ইত্যাদি।

 

খুলনার কিছু প্রচলিত আঞ্চলিক ভাষা

 

প্রচলিত শব্দ

শব্দেরঅর্থ

আইট বা আ’ট

বনের মধ্যে পূবর্বতন বসতির চিহ্নযুক্ত উচ্চ জমি।

আদলদার

পূর্বে লবণ প্রস্ত্তত হয়ে রাশীকৃত হলে তার উপর যারা ছাপ মেরে দিত।

আবাদ

জঙ্গলকে ’বাদা’ বলে এবং জঙ্গল ’উঠিত’হয়ে যখন ধান্যক্ষেত্রে পরিণত হয়, তখন তার নাম আবাদ।

আফালি

আস্ফালন। মৎস্যের আফালি।

আশে- নমস্কার

হাত বাড়িয়ে আশীর্বাদ ভিক্ষা করা। সম্মনিত ব্যক্তিকে সুন্দরবনে এভাবেই অভিবাদন জানান হয়।

উশকারা

মৎস্যে জলের ভিতর হতে বের হয়ে আবার ঢুকে যায়, তাকে উশকারা বলে।

ওঝা

মন্ত্রবিৎ ব্যক্তি। উপাধ্যায় শব্দের অপভ্রংশ।

ওত

শিকারের জন্য প্রস্ত্তত অবস্থা; বাঘে জঙ্গলের মধ্যে ’ওত’ পেতে বসে থাকে।

কয়াল

দালাল (ধানের)।

কল

ভেড়ী বা বাঁধের মধ্য দিয়ে জল নিষ্কাশনের কাষ্ঠ নির্মিত প্রণালী।

কল্লা

দুষ্ট, চতুর।

কাগজী

যারা পূবের্ব কাগজ প্রস্ত্তত করত, তাদের কাগজী উপাধি দেযা হতো।

কাঁচা(বাদা)

নিবিড় জঙ্গলপূর্ণ।

কাঠিকাটা (অধিবাসী)

যারা সর্বপ্রথমে বাদা কেটে বসতি স্থাপন করে। ঐরূপ জমিতে তাদের বিশেষ স্বত্ব স্বামিত্ব থাকে, এই অর্থে কাঠিকাটা শব্দ ব্যবহৃত হয়। যেমন, ইহা অমুকের কাঠিকাটা মহল।

কাঠির আবাদ

প্রথমতঃ জঙ্গল কেটে যে আবাদ হয়- তার নাম কাঠির আবাদ।

কাঠুরিয়া

যারা কাঠ কাটতে বনে যায়।

কাড়াল

নৌকায় মাঝির বসবার স্থান।

কাড়াল দেওয়া

কান্ডারীর কার্য করা বা হাল ধরা।

কাবলীওয়ালা

বাঘ। সম্ভবতঃ প্রকান্ড মূর্তির জন্য কাবুলিয়াদের নামানুসারে নাম হয়েছে।

কাবান

জঙ্গলে কাট কেটে রাখার ও আনার জন্য পরিস্কৃত প্রশস্ত স্থান।

কারিকর

গান রচয়িতা

কালাবন

নিবিড়ন

কুমোর

নদী বা খালের মধ্যে কাঁচা ডাল পাতা দিয়ে যে স্থানে মাছ আটকিয়ে রাখে।

কেরেচ বা কেরেচ্ ছিলা

ক্ষেতের মধ্যে এড়োভাবে (ডরম্র) ছোট বাঁধ বা ভেড়ী।

কোলা

নদী বা খালের কূলে প্রশস্ত স্থান।

খটি

সমুদ্র বা নদীতীরে মাছ ধরে শুকানোর আড্ডা।

খ’লেন

ধান মাড়াই করার স্থান।

খাদাড়ী বা খালাড়ী

লবণের কারখানা।

খাস জঙ্গল

সরকারের তত্ত্বাবধানে রক্ষিত বন()।

খেঁড়ো

গাজীল গীতের মূল গাইন, বা গাথক।

খোঁজ

চিহ্ন বা পদচিহ্ন। সন্ধান।

জিগীর

উচ্চ কীর্ত্তন বা শব্দ।

জো

জোয়ার। এক জো’ পথ অর্থাৎ যেতে এক জোয়ার লাগে (প্রায় ছয় ঘন্টা সময়)।

প্রচলিত শব্দ

শব্দেরঅর্থ

খোঁজ তোলা

কাদার মধ্যে চলার সময় চিহ্ন রেখে পা তুলে যাওয়া। যেমনঃ ’হরিণের খোঁজ তোলার শব্দ’।

গণ

অনুকূল নদী প্রবাহ।

গরম

হিংস্র জন্তুর ভয়যুক্ত। যেমন, ’ অমুক স্থান গরম’, অর্থাৎ যেখানে বাঘ আছে।

গলুই

নৌকার অগ্রভাগ।

গাইন

গায়ক

গাছাল

গাছে বসে শিকার।

গাছাল দেওয়া

শিকারের জন্য গাছে বসে থাকা।

গাজি

ব্যাঘ্রের দেবতা। যারা ব্যাঘ্র্ শিকার করে বা মেরে বীরত্ব দেখায়, তাদের গাজি উপাধি দেওয়া হয়।গাজি শব্দের প্রকৃত অর্থ ধর্ম্মযোদ্ধা।

গুন

যে দড়ি দ্বারা প্রতিকূল স্রো্তে নৌকা টেনে নেওয়া হয়।

গুনের রাস্তা

নৌকার দুই পার্শ্বের ’ডালির’ সাথে সংযোগ রেখে ২/১ হাত অন্তর যে শক্ত তলদেশে পা না দিয়েও যে কাঠগুলির উপর পা দিয়ে নৌকার সন্মুখ হতে পশ্চাৎ পর্যন্ত যাওয়া যায়, তার নাম ’গুঁরো’।

গোছা

নৌকার ভিতর তলদেশে ’বাগ’ লাগান থাকে, তাকে গোছা বলে।

গ্যাড়া

গন্ডার

ঘুঘু

ছোট ডিঙ্গি নৌকা।

ঘের

বনের যে অংশে কাঠ কাটার হুকুম হয়। যেমন, অমুক বাদায় এবার ঘের পড়েছে।

ঘোঘা

ভেড়ীর যে সরু ছিদ্রপথে নদীর লোনা জল ক্ষেতের মধ্যে প্রবেশ করে।

ঘোষড়(বন)

নিবিড় বা দুস্প্রবেশ্য।

চ’ট বা চইট

চলাচল বা যাতায়াত। যেমন, অমুক বনে খুব হরিণের চ’ট বা চইট আছে। অর্থাৎ সে বনে অনেক হরিণ চলাফেরা করে।

চ’ড় বা চইড়

নৌকা ঠেলে সরানোর বা চালানোর জন্য ব্যবহৃত সরু কাষ্ঠ বা বংশ দন্ড।

চাড়া

উচ্চ অর্থাৎ যেখানে বাঘের অত্যাচার আছে।

চাপান

নৌকা বাঁধা অবস্থায় থাকা।

চাপান সারা

রাত্রিতে নৌকারোহীদের নিদ্রার পূর্বে মন্ত্র দ্বারা বাঘের অত্যাচার নিবারণ করা।

চেলা

শিষ্য

চেরাক, চেরাগ

প্রদীপ

চোট

বন্দুকের আঘাট। চোট করা অর্থাৎ বন্দুকের গুলি করা।

ছই

নৌকার উপরিস্থ আবরণ।

ছড়া কাটা

কবি গানের দ্রুত কবিতা রচনা করে বলে যাওয়া।

ছাওয়াল পীর

পাঁচ পীরের অন্যতম।

ছাপ্পর

ছই

ছিট

ছোট গাছ, যেমন, ’সুন্দরের ছিট’; অর্থাৎ অল্প বয়স্ক সরু ও দীর্ঘ সুন্দরী গাছ।

ছিলা বা ছিলে ভিড়ী

অপেক্ষাকৃত ছোট ভেড়ী।

জয়াল

নদী তীরবর্তী প্রকান্ড ভূমিখন্ড, যা সময় সময় নদীর মধ্যে ভেঙ্গে পড়ে।

জায়গীর

বানর

জারী

জাহিরা বা প্রচার; এক প্রকার ধর্মের গান।

প্রচলিত শব্দ

শব্দেরঅর্থ

জোগা

অমাবস্যা - পূর্ণিমার নিকটবর্তী অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাসের সময়।

জোয়ার

সমুদ্র হতে উপর দিকে জলপ্রবাহ।

জোয়ারিয়া

উপর বা উত্তরের দিকে। যেমন, অমুক স্থান অমুক স্থানের জোয়ারে অর্থাৎ প্রথম স্থানে যেতে হলে দ্বিতীয় স্থান হতে জোয়ার দিয়ে নৌকায় যেতে হয়।

ঝা’ল

শুকনা গাছের অগ্রভাগ।

টোপ

খোলা স্থানে গর্ত করে তন্মধ্যে বসে শিকার করাকে টোপে শিকার বলে।

ডালি

নৌকায় তক্তা দ্বারা তলদেশ গড়ে এসে সর্বোপরি দুই পার্শ্বে যে অপেক্ষাকৃত পুরু দুইটি তক্তা লম্বালম্বিভাবে লাগান থাকে, তাকে ’ডালি’।

ডিঙ্গা

ব্যবসায়ীদের বড় নৌকা।

ডিঙ্গি

ছোট খোলা নৌাকা।

তারকেল

গোসাপ। এরা সর্বভক্ষক। কোন কোন স্থানে ’গো হাড়কেল’ নামে পরিচিত।

দ’ড়েল

যারা দড়ি দিয়ে পাঙ্গাস মাছ বা কাঁকড়া ধরে।

দোখালা

যেখানে দুই পাশে দুইটি সমান আকারে খাল গিয়েছে, তখন তাকে দোখালা বলে। কিন্তু যদি এর একটি খাল ছোট হয়, তাকে পাশখালি বলে।

দোয়ানী খাল

যে খালের দুই মুখেই একই সময়ে জোয়ারের জল প্রবেশ করে এবং দুই মুখেই ভাটির জল নেমে যায়।

দোস্তি

বন্ধুত্ব

ধে’ড়ো

শীর্ষ বা শীষ, যেমন, গোলের ধে’ড়ো।

ধোঁয়াকল বা ধুমাকল

স্টীমার

নদীর বাঁক

দিক্ পরিবর্তন করে একমুখে নদী যতদূর যায়।

নল ছেয়া বা নলছ্যাও

কোণাকোণি নদী পার হওয়া।

নাও, না, লাও, লা

নৌকা

না’য়ে বা লা’য়ে

নাবিক, নৌকার মাঝি।

নেমক

লবণ

পড়া

মরা, যেমন, অমুক বনে মানুষ পড়েছে, অর্থাৎ বাঘে মানুষ মেরেছে।

পলোয়ার

বড় ঢাকাই নৌকা।

পাটাতন

নৌকার উপরিভাগ যা তক্তা দ্বারা আচ্ছাদিত থাকে।

পাড়ি

উত্তরণ, পার হওয়া।

পাতারি

জলপ্লাবন নিবারণের জন্য ছোট বাঁধ।

পিঠেম বাতাস

পৃষ্ঠদিক হতে প্রবাহিত অনুকূল বায়ু।

পীর

দেবতা

পেরেম (প্রেম) কাদা

পলিমাটির আঠাল কাদা, যা লাগলে সহসা ছাড়তে চায় না।

পিঠেল

বনের পেট্রোল পুলিশ।

ফুলি

আলোক

বড় মিঞা

বাঘ

বড় শিয়াল

বাঘ

বড় হরিণ

বাঘ

বনবিবি

বনদেবতা; ’বিবির জহুরা নামা’াবে এর বর্ণনা আছে।

প্রচলিত শব্দ

শব্দেরঅর্থ

বয়াতি

বয়েৎ বা জারীগানের পদরচয়িতা।

বাইচ

ভাসান, নদীপথ, নৌকাবাহনের পাল্লা।

বাওন

বাহন, নদীবাহনে শিকার।

বাওয়ালী

বনওয়ালী, বনভ্রমনকারী মন্ত্রবিৎ ফকির।

বাগ

নৌকার মধ্যে তলায় যে ছোট ছোট কাঠ এড়োভাবে থাকে।

বাদাই ভাল

মন্দ বা মরণ; বাদায় মরার কথা বলে না। মৃত্যু হলেও ’ভাল হয়েছে’ এরূপ বলে।

বাটাল

গাছাল।

বাদা

জঙ্গল।

বালাম

এক প্রকার নৌকা এবং ঐ নৌকায় সরু সিদ্ধ চাল পূর্বদেশ হতে রপ্তানি হতো।

বালিয়াৎ

য়ে অনুচর অগ্রবর্তী হয়ে শিকার দেখিয়ে দেয়।

বা’লেট

বাঘ

বিশ

ধানের হিসাব, আনুমানিক ১৪ মণ ধান।

বে-গণ

প্রতিকূল নদীপ্রবাহ।

বেড়ো, বেরো বা বেরুয়া

গুন টানার জন্য ব্যবহৃত চোঙ।

বেতনাই

কাঠ বা গোলপাতা বোঝাই করার উপযোগী এক প্রকার বড় নৌকা।

বৈকারী

বানর

বৈঠা, বৈঠক

কাষ্ঠ নির্মিত যে পাতালা দাঁড় না বেঁধে হাতে তুলে বাইতে হয।

ভাটি-বাঙ্গালা

বাঙ্গালার দক্ষিণাংশ।

ভাটিয়াল

দক্ষিণ দেশীয়, যেমন, ভাটিয়াল চাউল, ভাটিয়াল সুর।

ভাটো

নিম্ন বা দক্ষিণ দিগবর্তী& যেমন, অমুক স্থান হতে অমুক স্থানের ভাটো, অর্থাৎ প্রথম স্থানে যেতে হলে দ্বিতীয় স্থান হতে নৌকা পথে ভাটিতে যেতে হয়। এক ভাটো পথ, অর্থাৎ যেখানে যেতে এক ভাটি লাগে (প্রায় ছয় ঘন্টা সময়)।

ভূইঞা

ভূম্যাধিকারী।

ভেড়ী

জলপ্লাবন নিবারণের জন্য বড় এবং উচ্চ বাঁধ।

ভোঁতড়

বাঘ

মড়াই

ধানের গোলা।

মাছি

ডাকাত, শত্রু।

মাঝি

নৌকার কর্ণধার।

মাঠাল

পায়ে হেঁটে শিকার।

মাদিয়া

দ্বীপ।

মানসেল

মনুষ্যালয়, মানুষের বসতি বিভাগ।

মায়া হরিণ

হরিণী।

মাল

মহল, সুন্দরবনের ডাঙ্গা।

মাহিন্দর

লবণ প্রস্ত্ততকারী মুজর।

মুখোড় বাতাস

প্রতিকূল বাতাস।

মোটা ভাষা

অশ্লীল ভাষা।

মোলঙ্গা

লবণ প্রস্ত্তত করার জন্য ভান্ড বা ভাঁড়।

প্রচলিত শব্দ

শব্দেরঅর্থ

মোলঙ্গী

যারা ঐরূপ করে লবণ প্রস্ত্তত করে।

মোহন, মোহড়া

মোহনা বা নদীর সঙ্গমস্থল।

রসাঙ্গী

যে ব্যক্তি লবণের রস নিয়ে ভাঁড়ে সরবরাহ করে।

শাকরেত

শিষ্য।

শিয়াল

শৃগাল, বাঘ।

শিরা

নদীবক্ষে স্রোতের প্রধান ধারা যে পথে যায়।

শিষে

অতি সরু খাল বা খাড়ি।

শূলো

সুন্দরী প্রভৃতি বৃক্ষের গোড়া হতে উর্দ্ধমুখী হয়ে যে সূচল শিকড় উঠে।

সড়া

নদী তীরে নৌকা উঠিয়ে রাখার জন্য যে খাল কেটে রাখা হয়।

সয়লা

জঙ্গলের মধ্যে শুঁড়ি পথ।

সাঁই

আড্ডা।

সারি বা সাড়ী গান

নদীপথে যেতে যেতে নাবিকেরা যে গান করে। তরঙ্গের মৃদু আন্দোলনে এতে এক প্রকার কেমন স্বরতরঙ্গ মাখানো থাকে। নৌকায় সারিবদ্ধভাবে বসে বা দাঁড়িয়ে গায় বলে এর নাম সারি গান।

সিঙ্গেল বা শিঙেল

পুরুষ হরিণ।

সির্নী, ছিন্নি

হিন্দুর দেবতা বা মুসলমান পীরের নামে উৎসৃষ্ট বোগ বা খাদ্যদ্রব্য।

সোরা

গাছের কাঠের মধ্যে যে অংশ নষ্ট হয়ে খোল হয়ে যায়।

স্থল-পাহারী

যারা লবণের খোলা চৌকি দিত।

হা’

বানর

হিসনে

যে দুইটি কাঠের সন্ধিস্থলে দাঁড়ের মধ্যস্থান বেঁধে দাঁড় বেয়ে থাকে, একে দাঁড়ের হিসনে বলে।

 

সংস্কৃতিঃ

 সংস্কৃতি একটি বিস্তৃত ধারণা। মানুষ প্রকৃতপক্ষে যা, তাই তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতির ভিতর দিয়েই পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে সত্যিকার জীবনধারা। জীবন বোধের পরিপূর্ণ রূপ পরিগ্রহ করে সংস্কৃতি। তাই মোতাহার হোসেন লিখেছিলেন, ‘‘কোন জাতি কতটা সভ্য তা নির্ভর করে তার শিল্প বা সংস্কৃতির উপর’’। সংস্কৃতি গতিশীল নদীর মত, বাঁকে বাঁকে পাল্টে যায় জীবনধারা তবে অস্থি মজ্জায় মিশে থাকা সংস্কৃতির স্রোত সঠিক ভাবেই নির্দিষ্ট গতিতে প্রবাহিত হয়।

 খুলনা বিভাগের সংস্কৃতি বৈচিত্রময়। সম্প্রদায়গত ঐক্যের কারণে এখানকার সংস্কৃতি মিলেমিশে এক হয়ে গেছে। যার ফলে হিন্দুদের বিভিন্ন পূজাঁ পার্বণে মুসলমানদের অংশগ্রহণ ছিল একটি লক্ষ্যণীয় বিষয়। মনসা মঙ্গল, পদাবলী কীর্তনে উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরা যোগ দিতেন। পদাবী কীর্তনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- নৌকা বিলাস, নিমাই সন্যাসী, বিল্লমঙ্গল পালা, দাতা কর্ণের উপাখ্যান প্রভৃতি।

 গাজী কালু ও চম্পাবতীও একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে এ অঞ্চলের সংস্কৃতিতে। এখানাকার কিছু মানুষ গাজী পীরের অনুসারী হলেও প্রায় সকলেই গাজীর গান বা গাজীর পট শুনতে সমবেত হয়। বয়াতি বা গাজী পীরের মুরিদগণ ঝাঁকড়া চুল ও হাতে আশা (এক প্রকার লাঠি) নিয়ে- পট গান পরিবেশন করে ও গান শেষে শিরনি দেয়।

 প্রাচীনকালে এখানে পালা গান ও কবিগানের প্রচলন ছিল। পালাগানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- চাঁদ-সওদাগরের পালা, রহিম রূপবানের পালা, নদের চাঁদের পালা, জামাল জরিনার পালা প্রভৃতি। এ পালা গানে নারী পুরুষ উভয়ে অংশগ্রহণ করতো।

 কবিগানে প্রসিদ্ধ ছিল এ অঞ্চল। চারণ কবিগণ বিভিন্ন আধ্যাত্মিক গান গেয়ে মানুষকে সম্মোহিত করতেন। কবিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন- তোরাব আলী বয়াতী, মোসলেম বয়াতী, বিজয় সরকার, রসিক সরকার প্রমুখ। এখনো লোকমুখে বিজয় সরকারের মরমী গান ধ্বনিত হয়। উল্লেখযোগ্য গানগুলির দু’একটি হলো-

‘‘আমার পোষা পাখী উড়ে গেলো সজনী...........’’

‘‘এ পৃথিবী যেমন আছে তেমনি ঠিক রবে

সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে’’

 এই বিভাগের কুষ্টিয়া অঞ্চলের বাউল সম্রাট লালন শাহ এর আধ্যাত্মিক চেতনা সমৃদ্ধ গান দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে খ্যাতি লাভ করেছে। উল্লেখযোগ্য গানগুলির দু’একটি হলো-

‘‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’’

‘‘জাত গেলো জাত গেলো বলে, একি আজব কারখানা’’

‘‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’’